ধর্ষণ – ইসলাম কি বলে?

What Islam Says about Rape

অনেকের ধারণা এটাই ধর্ষণের জন্য পোশাক দায়ী। নারীর পর্দাহীন চলাফেরা, সাজগোজ এসব ই মূলত একজন পুরুষ কে আকৃষ্ট করে।

এজন্য ধর্ষণের পর সমস্ত দোষ গিয়ে পড়ে ধর্ষিতার উপর। সমালোচনা হয় তার পোশাক নিয়ে। তাদের ভাষ্যমতে এমন টা যুক্তি দাঁড়ায় যে ইসলামে মেয়েদের পর্দা করতে বলেছে কিন্তু তারা যখন পর্দা করেনি তখন তাদের ধর্ষণ হবেই।

বেশ কিছুদিন ধরে ফেসবুকে, ব্লগে এবং সংবাদ পত্রে ধর্ষণ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের লিখালিখি হচ্ছে। এসব আলোচনা দেখে এ বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টি ভঙ্গিতে লিখার নিয়ত করেছি।

উইকিপিডিয়া মতে ধর্ষণ হলো-

Rape is a type of sexual assault usually involving sexual intercourse, which is initiated by one or more persons against another person without that persons consent.

ইসলামের মতে ধর্ষণ বা যিনা-আল জিবর হলো জোর পূর্বক বিবাহ বহির্ভূত জোর পূর্বক যৌন সঙ্গম যা ইসলামের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ। ইসলাম আইনের দৃষ্টিতে এটি হিরাবাহ শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত।

তিরমীজী এবং আবু দাউদের বর্ণিত একটি অভিন্ন হাদিসে নবী মুহাম্মদ কর্তৃক কোন এক ধর্ষক কে শাস্তি স্বরুপ পাথর নিক্ষেপে মৃত্যু দন্ড প্রদান করার কথা উল্লেখিত আছে।

আলকামা তার পিতা ওয়াযেল থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী করিম সাঃ এর যুগে জনৈক মহিলা সালাত আদায়ের জন্য গমন কালে পথি মধ্যে তার সাথে একজন পুরুষের দেখা হলে, সে ব্যক্তি জোর পূর্বক তাকে ধর্ষন করে। সে মহিলা চিৎকার করলে সে পথে যাওয়া জনৈক ব্যক্তি এর কারণ জানতে চায়। তখন সে মহিলা বলে; অমুক ব্যক্তি আমার সাথে এরুপ অপকর্ম করেছে। পরে তার পাশ মুজাহিরদের একটি দল গমণ কালে সে মহিলা তাদের বলেঃ অমুক ব্যক্তি আমার সাথে এরুপ কাজ করেছে। তারপর তারা এক ব্যক্তিকে ধরে আনে যার সম্পর্কে তাদের ধারণা ছিল যে এই ব্যক্তি ই এরুপ কাজ করেছে। এরপর তারা সে ব্যক্তি কে অই মহিলার কাছে আনলে মহিলা ও বলে যে হ্যাঁ এই ব্যক্তি ই অপকর্ম টি করেছে। তখন তারা এই লোকের বিচারের জন্য লোকটি কে আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাঃ এর কাছে নিয়ে যান। নবী করিম সাঃ যখন সে ব্যক্তির উপর শরীয়াতের নির্দেশ জারী করার মনস্থ করেন, তখন মহিলার সাথে অপকর্ম কারী ব্যক্তি দাঁড়িয়ে যায় এবং বলে- ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি-ই এই অপকর্ম করেছি। তখন আমাদের প্রিয় নবী করিম সাঃ ওই  মহিলা কে বলেন তুমি চলে যাও, এখানে তোমার অপরাধ নেই, আল্লাহ তোমাকে মাফ করে দিয়েছেন। এর রাসুল সাঃ নির্দেশ দেন – লোক টিকে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করো।

  • যামী আল-তি্রমিযি, সুরা আবু দাউদ

ধর্ষণের ক্ষেত্রে এক পাক্ষিক যিনা বা ব্যভিচার হয় অন্য পক্ষ হয় মজলুম বা নির্যাতিত। তাই মজলুম দের কোন শাস্তি হয়না। কেবল জালিম বা ধর্ষকের ই শাস্তি হবে।

ধর্ষণের ক্ষেত্রে দুটি অপরাধ সংঘটিত হয়-

  • যিনা বা ব্যভিচার
  • বলপ্রয়োগ বা ভীতি প্রদর্শন

তাই একজন ধর্ষক এই দুই ধরণের শাস্তি পাবে। যিনা এবং মুহারাবের শাস্তি।

মুহারাবা হচ্ছে, পথে কিংবা অন্যত্র অস্ত্র দেখিয়ে বা ভীতি প্রদর্শন করে  ডাকাতি করা। এতে কেবল সম্পদ ছিনিয়ে নেয়া হতে পারে অথবা হত্যা হতে পারে অথবা উভয় ই হতে পারে।

মুরহাবার শাস্তি আল্লাহ যেভাবে উল্লেখ্য করেছেন-

যারা আল্লাহ ও তার রাসুলের সাথে সংগ্রাম করে এবং দেশে হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হচ্ছে এই যে, তাদের কে শূলীতে চড়ানো হবে অথবা হত্যা করা হবে অথবা তাদের হস্তপদ সমূহ বিপরীত দিক থেকে কেটে দেয়া হবে। অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে। এটি হচ্ছে তাদের জন্য পার্থিব লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি (মাযিদাঃ৩৩)

এ আয়াত থেকে বিখ্যাত মালেকী ফকীহ ইবনুল আরাবী ধর্ষণের শাস্তিতে মুরহাবার শাস্তি প্রয়োগের মত ব্যাখ্যা করেছেন।

উল্লেখ্য, ধর্ষক যদি বিবাহিত হয়, তাহলে এমনিতেই তাকে পাথর মেরে মৃত্যুদন্ড দেয়া হবে। কিন্তু সে যদি বিবাহিত না হয় তাকে বেত্রাঘাতের পাশাপাশি বিচারক চাইলে দেশান্তর করতে পারেন। কিংবা অপরাধ গুরুতর হলে অথবা পুনরায় হলে বিচারক মুরহাবার শাস্তি ও দিতে পারেন।

ইসলামের বিধানের আলোকে বাংলাদেশের ধর্ষণ আইনের পর্যালোচনাঃ-

১) বাংলাদেশের আইনে ধর্ষণের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে,

যদি কোন পুরুষ বিবাহ বন্ধন ব্যতীত ষোল বৎসরের অধিক কোন নারীর সাথে তাহার সম্মতি ব্যতিরেকে বা ভীতি প্রদর্শন করিয়ে বা প্রতারণা মূলক ভাবে তাহার সম্মতি আদায় করিয়া, অথবা ষোল বৎসরের কম বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতি সহ অথনা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌন সঙ্গম করেন, তাহা হইলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করিয়াছেন বলে গণ্য হবেন।

ইসলামের সাথে এই সংজ্ঞার তেমন কোন বিরোধ নেই। তবে এতে কিছু অসামঞ্জস্যতা আছে।

ইসলাম সম্মতি অসম্মতি উভয় ক্ষেত্রে নারী পুরুষের বিবাহ বহির্ভূত দৈহিক মিলন কে দন্ডনীয় অপরাধ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু এই আইনে কেবল অসম্মতির ক্ষেত্রে তাকে অপরাধ বলা হয়েছে।

সম্মতি ছাড়া বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক ইসলাম ও দেশীয় আইন উভয়ের চোখে অপরাধ। আর সম্মতি সহ সম্পর্ক ইসলামে অপরাধ, দেশীয় আইনে নয়।

আসলে এ কথা মাথায় রাখতে হবে যে সম্মতি আর অসম্মতির বিভাজন রেখা খুব ঠুনকো। এত দ্বারা ধর্ষণ কখনোই রোধ করা সম্ভব নয়।

একই ব্যক্তি তার স্ত্রী ভিন্ন অন্য নারীর সাথে সম্পর্ক করে পার পেয়ে যাবে, তখন সে এক পর্যায়ে জোর পূর্বক ও তা করবে। ইসলাম মানুষের চাহিদা কে সীমিত করে দেয়। বিবাহ ছাড়া কোন নারী পুরুষ দৈহিক সম্পর্কে জড়ালে তাকে অপরাধ বলে গণ্য করে। কাজেই জোর পূর্বক করাকে অনুমোদন দেয়ার প্রশ্নই আসেনা।

২) আইনে ষোল বছরের কথা উল্লেখ্য করেছে অর্থাৎ আইনে বয়স উল্লেখ্য করেছে।

কিন্তু ইসলামে কোন বয়স উল্লেখ্য নাই।

৩) আইনে ধর্ষণের কারণে মৃত্যু না হলে ধর্ষকের মৃত্যু দন্ড হবেনা। কেবল যাবজ্জীবন কারাদন্ড এবং অর্থ দন্ড। পক্ষান্তরে ইসলামে বলা হয়েছে কেউ ধর্ষণের মত অপকর্ম করলে কোন ভাবান্তর ছাড়াই তার শাস্তি রজম বা পাথর মেরে মৃত্যু দন্ড।

ইসলামে ধর্ষণ প্রমাণ করাঃ-

ইসলামে দুটোর যেকোন একটি জরুরী- ১)জন স্বাক্ষ্য, ২)ধর্ষকের স্বীকারোক্তি।

তবে স্বাক্ষ্য না পাওয়া গেলে আধুনিক ডিএনএ টেস্ট, সিসি ক্যামেরা, মোবাইল ভিডিও,  ধর্ষিতার বক্তব্য ইত্যাদি অনুযায়ী ধর্ষক কে দ্রুত গ্রেফতার করে স্বীকার করার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে হতে পারে। স্বীকারোক্তি পেলে তার উপর শাস্তি কার্যকর করা হবে।

অতেব বোঝায় যাচ্ছে এক্ষেত্রে ধর্ষিতার কোন শাস্তি নেই। কিন্তু অনেকেই যে পোশাক কে দায়ী করেন তাদের জন্য ও এটা সত্য যে মহিলা যে পোশাক পড়েই থাকেন না কেন সব পরিস্থিতিতেই ধর্ষক কে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। ধর্ষণ ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ তাই তো পিশাচ রুপী ধর্ষক দের জন্য পার্থিব শাস্তি সব নয়। পরকালে ও তাদের জন্য কঠিন শাস্তি অপেক্ষা করছে।

ইসলামে সর্ব প্রথম মহান আল্লাহ তায়ালার উপর ইমান আনার সাথে সাথে সকল প্রকার অসৎ, অশ্লীল ও মন্দ কর্ম পরিহার ও সৎ পথে চলার শিক্ষা ও দীক্ষা দেয়া হয়। তাই ইসলামী সমাজের সাথে সম্পৃক্ত কোন ব্যক্তি যদি এরপরে ও এ ধরণের পাশবিক কর্মে জড়িয়ে পরে, তাহলে তাকে শাস্তি দেয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here