আজ বিপ্লবী শান্তি ঘোষ দাসের ১০০তম জন্ম বার্ষিকী

স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং অন্যতম বিপ্লবী শান্তি ঘোষ দাস (জন্মঃ- ২২ নভেম্বর, ১৯১৬ – মৃত্যুঃ- ২৭ মার্চ, ১৯৮৯)

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে দুটি উজ্জ্বল নাম শান্তি ও সুনীতি। তাঁরা দু’জনই ছিলেন কিশোরী। তাঁদের পথিকৃৎ ছিলেন– স্বর্ণকুমারী দেবী, সরলা দেবী, আশালতা সেন, সরোজিনী নাইডু, ননী বালা, দুকড়ি বালা, ইন্দুমতি দেবী, লীলা রায় ও সাবিত্রী দেবীসহ আরও অনেকে।
কুমিল্লার (তৎকালীন ত্রিপুরা) ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট সিজিবি স্টিভেন্স ছিলেন অত্যাচারী ব্রিটিশ কর্মকর্তা। তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সে সময় বিপ্লবীরা তাকে নিধন করার পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনাকারীরা হলেন বিপ্লবী অখিলচন্দ্র নন্দী, বীরেন্দ্র ভট্টাচার্য ও সতীশ রায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজের দায়িত্ব দেয়া হয় শান্তি ও সুনীতিকে। শান্তি ঘোষ ও সুনীতি চৌধুরীকে বিপ্লবী যুগান্তর দলে সংযুক্ত করেছিলেন নবম শ্রেণির ছাত্রী প্রফুল্ল নলিনী ব্রহ্ম। শুরু হয় তাদের অস্ত্র চালনা শিক্ষা। এই দায়িত্ব নেন বীরেন্দ্র ভট্টাচার্য ও সতীশ রায়। স্থান নির্ধারিত হলো কুমিল্লা কোটবাড়ির নির্জন পাহাড়।

১৯৩১ সালের ১৪ ডিসেম্বর স্বাভাবিকভাবেই চলছিল শহরের সকলের কাজ। দুই বিপ্লবী শুধু ব্যাতিক্রম। শান্তি, সুনীতির বাৎসরিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে ১২ ডিসেম্বর। স্কুলে অনুষ্ঠান আছে এ কথা বলে শাড়ি পরে শরীরে চাদর জড়িয়ে তারা বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন। চাদরের নিচে লুকিয়ে রেখেছিলেন অস্ত্র। শান্তি .৪৫ ক্যালিবারের রিভলভার এবং সুনীতি .২২ ক্যালিবারের রিভলবার সঙ্গে নিয়েছিলেন। এ ছাড়াও সেদিন তারা সঙ্গে নিয়েছিলেন কুমিল্লায় সাঁতার প্রদশর্নীর একটি অনুমতিপত্র।

এরপর তারা বিনা বাধায় ম্যাজিস্ট্রেটের বাংলোতে পৌঁছে যান। তখন সময় প্রায় সকাল দশটা। ইন্টারভিউ স্লিপ দিলে কিছুক্ষণের মধ্যেই বাংলোর অফিসে এলেন তাদের প্রত্যাশিত সিজিবি স্টিভেন্স, সাথে এলেন মহকুমা প্রশাসক নেপালচন্দ্র সেন। এগিয়ে আসতেই শান্তি এগিয়ে দিলেন সাঁতার প্রদর্শনীর দরখাস্তটি। এরপর স্টিভেন্স দরখাস্তটি শান্তির হাতে ফেরত দেওয়ার পূর্বেই গর্জে উঠল শান্তির .৪৫ বোরের রিভলভার। অব্যর্থ নিশানা। স্টিভেন্স লুটিয়ে পড়লেন। এ সময় সুনীতির গুলিতে আহত হলেন এসডিও সাহেব। হঠাৎ চাপরাশি রুছমত আলী শান্তিকে ধরতে এলে শান্তি তাকেও গুলি করে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয় না। চাপরাশি ইয়াছিন এবং কনস্টেবল নোনা মিয়া তাদের দুজনকে ধরে ফেলেন। এই ঘটনায় কুমিল্লা কোতয়ালী থানায় মামলা হয়। পুলিশ তাঁদের ওপর প্রচণ্ড অত্যাচার চালায়। এ সত্ত্বেও তাঁদের কাছ থেকে গুপ্ত কথা আদায় করা পুলিশের পক্ষে সম্ভব হয়নি।

থানায় মামলা হলেও তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এনসি বোস এক পত্রে The Chief Secretary, Government of Bengal, Political Department Calcutta বরাবর লেখেন (১৯৩১ সালের ২০ ডিসেম্বর) কুমিল্লার পুলিশসহ জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের মতামত হলো এটি একটি নৃশংস হত্যা মামলা ও অস্ত্র মামলা। তাই এই মামলাটি জেলা দায়রা জজ আদালতে না হয়ে স্পেশাল ট্রাইবুনালে বিচার করা হোক। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুরোধক্রমে কলকাতা হাই কোর্টের স্পেশাল ট্রাইবুনালে বিচার সম্পন্ন হয়। এরপর শান্তি ও সুনীতিকে নিয়ে আসা হয় আলিপুরে সেন্ট্রাল জেলে। তখন তাঁদের বয়স ছিল মাত্র ১৪। এই কিশোরীদের কোর্টে দেখতে শত শত সাধারণ মানুষ আসতেন। শান্তি ও সুনীতির চোখে ছিল বিদ্রোহের দৃষ্টি। ভয় বলে ওরা কিছু জানত না। ১৯৩২ সালের ২৭ জানুয়ারি রায়ে বিচারকগণ বলেন, মামলা চলাকালীন সময়ে এই দুই কিশোরীকে হাস্যোৎফুল্ল দেখেছি। তাদের কারো বয়সই ১৬ বৎসরের অধিক না হওয়ায় তাদেরকে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে যাবজ্জীবন কারা দণ্ডে দণ্ডিত করা হলো। এই দুই বিপ্লবী ১৯৩৭ সালে কারামুক্তি লাভ করে পুনরায় ছাত্রজীবনে ফিরে আসেন।

জন্ম
তিনি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ ও মা শৈলবালা ঘোষ। এই পরিবারের আদি নিবাস বরিশাল জেলায়। শান্তি ঘোষ-এর বাবা কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের দর্শন বিভাগে অধ্যাপনা করতেন। বাবার উৎসাহে শান্তি ঘোষ বিপ্লবী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হন। শান্তি যখন জেলে তখন মেয়ের নিকট এক পত্রে তিনি লিখেছিলেন, ‘তুমি যে হস্ত দ্বারা এই বিপ্লবী কর্মটি করেছ সে হাত ঈশ্বরের ছিল, ঈশ্বরই তোমাকে জেল থেকে মুক্ত করে আমার কোলে ফিরিয়ে আনবে।’

১৯৪২ সালে শান্তি ঘোষ চট্টগ্রামের আরেক বিপ্লবী চিত্তরঞ্জন দাসের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। পরবর্তীতে তিনি ভারতীয় কংগ্রেসের সদস্য হিসেবে ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির সদস্য ছিলেন। তার আত্মজীবনী গ্রন্থ রয়েছে ‘অরুণ বহ্নি’। ১৯৮৯ সালের ২৭ মার্চ শান্তি ঘোষ মারা যান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here