অভিলাষ মাহমুদ’র “ছোট গল্প” এক পিছ হালুয়া

রাস্তার এক পাশ দিয়ে হাঁটছিলাম যাযাবরের মতো।
পকেটে মাত্র দশটাকার একটা নোট ছাড়া আর কোনো টাকা ছিলো না। খুব ক্ষুদাও লেগেছে। সকালের আজানের আগে হাঁটা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়লাম বাড়ি হতে প্রায় সাড়ে চার থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে। মুঠোফোনের ঘড়িতে দেখলাম সাতটা ঊনিশ মিনিট। মাথা তুলতেই চোখ গিয়ে ঠেকলো আমার দক্ষিণ দিকের একটা হোটেলের দিকে। দু’পা এগিয়ে এক লাফে ক্যাশের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ক্যাশিয়ার তখন হিসাবের খাতার পৃষ্ঠা উল্টাতে লাগলেন।
আমাকে দেখেই স্ব-হাস্যে- কী দেবো স্যার? বসুন না স্যার, সিটে গিয়ে।

সকাল সকাল স্যার ডাক শুনে মনকূয়াতে খুশির জল উছলিয়ে পড়ছে।
-দিন এক পিছ হালুয়া। এই বলে পকেট থেকে দশ টাকার নোটটি বের করে দিলাম। তিনি দক্ষিণ হস্তে নিয়ে ক্যাশে রাখতে রাখতে দোকানের কোনো এক কর্মচারীকে আদেশের সুরে বললেন- এই, স্যারকে এক পিছ হালুয়া দাও।
আমার উত্তর দিক হতে এক শ্যামলা মাঝারি গঠনের তরুণ এসে নগ্ন হস্তে এক পিস হালুয়া নিয়ে একটি কাগজের ঠোঙ্গায় পুরে আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো- এই নিন স্যার।
তখনো সে খেয়াল করেনি আমার রাগি মূর্তি।
আমি তা নিতে নিতে বললাম- হালুয়াটা কাঁটা চামচ দিয়ে না দিয়ে হাতে দিলা কেনো?
ঐ কর্মচারী কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়লো কাঠের পুতুলের মতো।
ক্যাশিয়ার তা লক্ষ্য করলো- তুমি হালুয়াটা কাঁটা চামচে করে না দিয়ে হাতে দিলা কেনো?
কর্মচারী তার হাত টেবিলের উপর রেখেই বললো- স্যার, এটা বদলে দেই?
আমি এবার একটু নম্র স্বরে বললাম- দেখো, টেবিলে এই যে তোমাার হাত খানা রাখলে এখানে কি ময়লা নেই? ঐ ময়লা কি তোমার হাতে লাগেনি? সেই ময়লা হাত থেকে আবার হালুয়ায় লাগেনি?
– আচ্ছা, স্যার। বদলিয়ে দিচ্ছি, আপনার হাতের হালুয়াটা দিয়ে দিন।
– আরে না, লাগবে না। আমার কথা না হয় বাদ দিলাম পরের বার থেকে কাউকে দেবার সময় খেয়াল করে কাঁটা চামচে করে দিবা।
– আচ্ছা স্যার।
এতোক্ষণে খেয়াল করলাম আমার চার পাশে মানুষ জড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন।
হঠাৎ আমার জোড়া ঠোঁটের মধ্যখানে এক চিলতে হাসির রেখা উদয় হলো। কেউ খেয়াল করলো কি না করলো তা না দেখে স্বাভাবিক হয়ে গেলাম আর বের হতে হতে ভাবছি হালুয়া শিরনামের কোনো নাটক বা সিনেমায় আমি নায়কের অভিনয় করছি। পথে নেমেই খেয়াল করলাম উদম গায়ের সাত কি আট বছরের একটা ছেলে হালুয়া নিয়ে দ্রুত গতিতে দৌড় দিতে গিয়ে একটা মটর সাইকেলের সাথে হালকা ধাক্কা লেগে পড়ে গেলো হালুয়া সমেত। জলদি সে হালুয়াটা তুলে নিয়ে ময়লাগুলো সরাতে চেষ্টা করতে লাগলো। এ দিকে তার পায়ের গোড়ালি থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে সেই খেয়াল তার নাই। মটর সাইকেল এতোক্ষণে অদৃশ্য হয়ে গেলো।

হালুয়াটা নিয়ে যেইনা সামনে দৌড় দিতে উদ্যাত হলো তখনই আবার একটা মাইক্রো বাস তাকে ধাক্কা দিয়ে চলে গেলো দ্রুত গতিতে, ধাক্কাটা শরীরে না লেগে , সেই হাতেই লাগলো বলে সে পড়ে যায়নি। তার তেমন কিছু না হলেও হালুয়াটা আর রক্ষা হলো না। পড়ে যেতেই একটা কুকুর পশ্চিম দিক থেকে দৌড়ে এসে তুলে নিয়ে গেলো। আমি তার মুখাকাশে দেখতে পেলাম বিষাদী মেঘের আনাগোনা। যেনো সে হতাশার পালকিতে চড়ে সম্মুখে এগুতে লাগলো। আমিও পিছু নিলাম। পূর্ব দিকে কয়েক গজ দূরে একটা কালো ফুটফুটে ফ্রগ পরা চার বা পাঁচ বছরের একটি মেয়ে বৈদ্যুতিক ফিলারে সাথে হেলান দিয়ে বসে কাঁদছে। ছেলেটাকে দেখা মাত্রই বলে ওঠলো- ভাইয়া, হালুয়া আনছো?
ছেলেটির নিরবতা আর তার বোনের চোখে অশ্রু দেখে আমার চোক্ষু ঝরনার জল কলকলিয়ে বুকের পাহাড় বেয়ে নিম্নগামী হতে লাগলো…
আমি ভাবতে লাগলাম ওদের স্থানে ছোটো বোনকে নিয়ে আমিও তো হতে পারতাম।
তখন আবার মনে এলো হালুয়াটা ওখানে বসে খেয়ে নিতে পারতাম। কিন্তু একটা কথা আছে কার রিজিক কোথায় কেউ আগাম বলতে পারে না। আমার হালুয়াটা ঐ মেয়েটার দিকে এগিয়ে বললাম- এই নে বোন, তোর জন্য এই হালুয়া।
দুজনেই আমার দিকে চেয়ে আছে। মেয়েটির ডান হাতে হালুয়াটা তুলে দিতেই বাম দিক থেকে ছেলেটি বললো- ভাইয়া আপনার চোখে পানি…।
আহা বাস্তবতা! কতই না নির্মম! আমি হাঁটছি সামনের দিকে ঘটনাটা অতীত হয়ে যাবে। কিš‘ আমার চোখের সামনে সব সময় থাকবে বর্তমান হয়ে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here